বৃহস্পতিবার, ২৬ আগস্ট, ২০২১

হেনরি কিসিঞ্জারের চোখে আফগানযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দায়?

আফগানিস্তানকে পুরোপুরি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব ছিল না, কিন্তু সৃজনশীল কূটনীতি এবং শক্ত অবস্থান হয়তো সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করতে পারতো। আফগানযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমাপ্তি টানার পেছনের সম্ভাব্য কারণগুলো বলতে গিয়ে এমন মন্তব্য করেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার। দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে আফগানযুদ্ধ নিয়ে সাবেক এ কূটনীতিকের বিভিন্ন মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।

হেনরি কিসিঞ্জার বলেন, একটি অন্তর্নিহিত সমস্যা ভিয়েতনাম থেকে ইরাক পর্যন্ত এক প্রজন্ম ধরে আমাদের জঙ্গিবিরোধী প্রচেষ্টাকে দমন করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজ দেশের সেনাদের নিরাপত্তার ঝুঁকি নেয়, মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় তখন অবশ্যই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে কূটনৈতিক কৌশলগুলোর সংমিশ্রণের ভিত্তি তৈরি করতে হবে।

jagonews24

কৌশল বলতে তিনি বলেন, স্পষ্ট করতে হবে কাদের জন্য আমরা যুদ্ধ করছি, তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী, সেটির একটি কাঠামো নির্মাণ করা, এর ফল কী হতে পারে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলকে কেন্দ্র করে।

তিনি আরও বলেন, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্জনগুলোকে স্পষ্ট করতে না পারা এবং আমেরিকার যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সেটার সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে না পারাও একটা কারণ। সেনাবাহিনীর যে পরম ধারণা সেগুলোর সঙ্গে রাজনীতির সম্পৃক্ততার যে বিষয়টি সেটি অস্পষ্ট থেকে গেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ ব্যাপারগুলোর বিতর্ক নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণে কাজে লাগেনি।

jagonews24

হেনরি কিসিঞ্জার বলেন, আল কায়েদার হামলার পর তালেবানশাসিত আফগানিস্তানে যখন আমরা প্রবেশ করি তখন সেখানকার মানুষের পুরোদমে সমর্থন ছিল। প্রাথমিক সামরিক অভিযান সফল হয়েছিল খুব দ্রুত। তালেবান কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং পাকিস্তানের সহায়তায় টিকে ছিল।

তিনি আরও বলেন, যখন তালেবানরা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছিল তখন আমরা কৌশলগত মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমরা নিজেদেরকে নিশ্চিত করেছিলাম যে, সন্ত্রাসী ঘাঁটির পুনঃপ্রতিষ্ঠা রোধ করা শুধু আফগানিস্তানকে গণতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিকভাবে শাসিত একটি সরকার দিয়ে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা সম্ভব। এ ধরনের ভাবনার সঙ্গে আমেরিকার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কোনো সাদৃশ্য নেই। ২০১০ সালে আমি সতর্কবার্তাও দিয়েছিলাম।

jagonews24

হেনরি আরও বলেন, আফগানিস্তান কখনই আধুনিক রাষ্ট্র ছিল না। রাষ্ট্রের সাধারণ বাধ্যবাধকতা এবং কর্তৃত্ববাদী আচরণে চলছিল এটি। কিন্তু আফগাান মাটি খুবই সমৃদ্ধ। কিন্তু শুধু একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র না হওয়ার কারণে সেখানে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ চলায় আমেরিকানদের মধ্যে সমর্থন দুর্বল হয়ে পড়ে। তালেবানকে সেসময় ধ্বংস করা গেলেও একটি সুসংগঠিত সরকার গঠন অসম্ভব হয়ে উঠে। এটাও ঠিক যে তালেবানকে একেবারে নির্মূল করা যায়নি। তবে জঙ্গিবিরোধী প্রচেষ্টার সমন্বয় করা কী সম্ভব হতো। যেখানে ভারত, চীন রাশিয়া এবং পাকিস্তানের ভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। সেকারণে একটি সৃজনশীল কূটনীতি আফগানিস্তানে সন্ত্রাস দমনে সহায়ক হতো।

jagonews24

হেনরি বলেন, কিন্তু কোনো বিকল্প তখন ভাবা হয়নি। ফলে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর পর তালেবানের সঙ্গে শান্তি চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছেন। যদিও ২০ বছর আগে যাদেরকে দমনের জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি এবং মিত্রদের সাহায্য করতে বলেছি। সেনা প্রত্যাহার আকস্মিকভাবে ঘটানোর কিছু ছিল না। যেখানে আমেরিকা তার ঐতিহাসিক এবং সক্ষমতার মূল্যবোধের কারণে বিশ্বে টিকে আছে, সেখানে পালানোর মতো কিছু নেই।

তিনি বলেন, এখনও সন্ত্রাসবাদ পুরো বিশ্বের কাছে বড় চ্যালেঞ্জের। জাতীয় কৌশলগত স্বার্থ দ্বারা এটিকে প্রতিহত করতে হবে। আমরা যেকোনো আন্তর্জাতিক কাঠামোসহ একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কূটনৈতিক পথ তৈরি করতে পারি। বাইডেন প্রশাসন এখনও প্রথম পর্যায়ে রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনায় একটি টেকসই এবং অনন্য কৌশল কাজে লাগানোর সুযোগ আছে।

এসএনআর/এসএইচএস/এমকেএইচ



Advertiser